বাংলাদেশ বিমানের বিরুদ্ধে ভয়ংকর তথ্য ফাঁস করে দিলেন হ্যাকাররা



 আন্তর্জাতিক হ্যাকার গোষ্ঠী ‘অ্যানোনিমাস’ বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সকে ঘিরে এক বিস্ফোরক তথ্যচিত্র প্রকাশ করেছে, যা দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। সম্প্রতি খ্যাতনামা সাংবাদিক জুলকারনায়েন সায়ের এর ফেসবুকে এক ভিডিওবার্তায় তারা বিমানের পাইলট নিয়োগে দুর্নীতি, কোটি কোটি টাকার চোরাচালান, মানবপাচার এবং নারী ক্রুদের ভয়াবহ যৌন হয়রানি ও ধর্ষণের মতো গুরুতর সব অভিযোগ তুলে ধরেছে। এই ঘটনাগুলোকে ধামাচাপা দিতে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। অ্যানোনিমাস তাদের এই অভিযানকে ‘ব্যক্তিগত’ হিসেবে উল্লেখ করে জানিয়েছে, বিমানের একজন নারী কর্মীর আত্মহত্যার ঘটনা তাদের এই তদন্তে নামতে বাধ্য করেছে।


ভিডিওতে অভিযোগ করা হয়, বিমানের দুর্নীতির শিকড় প্রোথিত রয়েছে এর নিয়োগ প্রক্রিয়ার ভেতরেই। ২০১৯ ও ২০২০ সালের পাইলট নিয়োগ পরীক্ষায় পাস নম্বর ৪ থেকে বাড়িয়ে ৩২ করা হয় অতিরিক্ত ‘গ্রেস মার্কস’ দিয়ে, যা ছিল নির্লজ্জ দুর্নীতির একটি উদাহরণ। ২০২২ সালে, বিমানের তৎকালীন চিফ অফ ট্রেনিং ক্যাপ্টেন সাজিদ আহমেদ নিয়োগ পরীক্ষার বিজ্ঞাপন ফাঁস করে এবং যোগ্যতার শর্ত কমিয়ে নিজের পছন্দের প্রার্থীদের সুযোগ করে দেন। এমনকি তিনি তার স্ত্রী সাদিয়া আহমেদকে একটি জাল ডিগ্রি দিয়ে চাকরিতে প্রবেশ করান বলে অভিযোগ করা হয়। ক্যাপ্টেন ইশতিয়াক হোসেনের বিরুদ্ধে স্বজনপ্রীতির অভিযোগ এনে বলা হয়, তিনি রাষ্ট্রীয় টাকায় লন্ডন ভ্রমণ করে নিজের ছেলে সাদিফ হোসাইনকে পাইলট হিসেবে নিয়োগ দেন। এছাড়াও, ক্যাপ্টেন হেলালের ছেলে মোহাম্মদ শায়েখ এবং ক্যাপ্টেন হাসনাইনের মেয়ে শারমিন চৌধুরীসহ আরও বেশ কয়েকজনকে নিয়মবহির্ভূতভাবে নিয়োগ দেওয়া হয়।


নিয়োগ দুর্নীতির পাশাপাশি বিমানকে আকাশপথে চোরাচালানের স্বর্গরাজ্য হিসেবেও অভিহিত করা হয়েছে। অ্যানোনিমাসের দাবি, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স সোনা, মাদক এবং মানবপাচারের একটি নিরাপদ রুটে পরিণত হয়েছে। ২০১৩ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে বিমানের ফ্লাইট থেকে ৭৫৬ কেজি সোনা উদ্ধার করা হয়, যা তাদের মতে চোরাচালানের একটি ক্ষুদ্র অংশ মাত্র। ২০২০ সালে অস্ট্রেলিয়ার উদ্দেশ্যে যাওয়া একটি কার্গো ফ্লাইট থেকে ১২.৩২ কেজি অ্যামফিটামিন (মাদক) জব্দ করা হয়। মানবপাচারের মতো ভয়ঙ্কর অপরাধেও বিমানের কর্মকর্তাদের জড়িত থাকার অভিযোগ আনা হয়েছে। ২৫শে মার্চ, ২০২৫-এ বিমানের কর্মকর্তা শওকত আলীকে কুখ্যাত মানবপাচারকারী মোহাম্মদ ফখরুদ্দিনকে সহায়তার জন্য গ্রেপ্তার করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, তারা বিমানের ক্রুদের পরিচয়পত্র ও ভুয়া বোর্ডিং পাস ব্যবহার করে লিবিয়া হয়ে মানবপাচার করত। এইসব ঘটনা যার সময়কালে ঘটেছে, সেই সাবেক জিএম কার্গো, রাশেদুল করিমকে তদন্তের আওতায় না এনে উল্টো পদোন্নতি দিয়ে গ্রাহক সেবা পরিচালক করা হয়েছে বলে ভিডিওতে উল্লেখ করা হয়।


ভিডিওটির সবচেয়ে ভয়ঙ্কর অংশে উঠে এসেছে নারী ক্রুদের ওপর যৌন নিপীড়নের চিত্র। অ্যানোনিমাস জানায়, তারা শতাধিক নারী ক্রুর সাথে কথা বলেছে এবং দেখেছে যে বিমানের অভ্যন্তরে একটি ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে, যেখানে অভিযোগ করলে ভুক্তভোগীকেই শাস্তি পেতে হয়। অভিযোগের তালিকায় বেশ কয়েকজন সিনিয়র কর্মকর্তার নাম উঠে এসেছে। ফার্স্ট অফিসার এম. এ. কাদের চৌধুরী ভুয়া সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট থেকে মাঝরাতে নারী ক্রুদের নিজের কক্ষে আসার জন্য অনৈতিক প্রস্তাব দেন। ক্যাপ্টেন রাব্বি নারী ক্রুদের গভীর রাতে ফোন করে হয়রানি করেন এবং অল্পবয়সী মেয়েদের সঙ্গে তার সম্পর্কের কথা দম্ভ করে বলেন। আশ্চর্যের বিষয় হলো, হয়রানির তদন্তের জন্য গঠিত কমিটির সদস্যও তিনি। ভুয়া লাইসেন্সধারী ক্যাপ্টেন আব্দুর রহমানের বিরুদ্ধে ভুক্তভোগীদের অন্তরঙ্গ মুহূর্তের ছবি তুলে ব্ল্যাকমেইল করার অভিযোগ রয়েছে। নিজেকে গোয়েন্দা সংস্থার (DGFI) লোক পরিচয় দিয়ে তিনি হুমকি দিতেন বলেও জানানো হয়। ক্যাপ্টেন ইউসুফ মাহমুদের বিরুদ্ধে ফ্লাইটের মধ্যে নারী ক্রুদের গায়ে হাত দেওয়া এবং কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করার অভিযোগ রয়েছে। ক্যাপ্টেন ইশতিয়াক হাতের রেখা দেখার নামে ফ্লাইটে নারী ক্রুদের হাত চেপে ধরতেন বলে অভিযোগ। ফ্লাইট স্টুয়ার্ড শপনিলের বিরুদ্ধে একাধিক নারী ক্রুকে ধর্ষণের অভিযোগ আনা হয়েছে এবং ইউনিয়ন নেতা আবিরের ছত্রছায়ায় তিনি সুরক্ষিত থাকেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ফ্লাইট পার্সার সুমনের বিরুদ্ধেও ধর্ষণের চেষ্টার মতো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে, যা ইউনিয়ন দ্বারা ধামাচাপা দেওয়া হয়। ভিডিওতে বলা হয়, ১৫ জন নারী পাইলটের মধ্যে ৯ জনই (৬০%) যৌন হয়রানির আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করেছেন, কিন্তু কোনো প্রতিকার পাননি। উল্টো ‘পাইলট সংকট’-এর অজুহাতে অভিযুক্তদের ফ্লাইট চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে।


ভিডিওর শেষে অ্যানোনিমাস অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে এক প্রকার যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। তারা জানিয়েছে, আগামী ১০ই জুলাই থেকে ‘অপারেশন নো সেফ হারবার’ শুরু হবে। এই অভিযানের আওতায় অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত জীবনে সাইবার হামলা চালানো হবে। তাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, গোপন সম্পদ এবং ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস করে দেওয়া হবে বলে হুমকি দেওয়া হয়েছে। গোষ্ঠীটি আরও জানায়, একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন এবং ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা হলে তারা তাদের হাতে থাকা সমস্ত প্রমাণ হস্তান্তর করবে। অন্যথায়, তারা নিজেরাই অভিযুক্তদের জীবন দুর্বিষহ করে তুলবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে। এই ঘটনা বিমানের স্বচ্ছতা ও ব্যবস্থাপনাকে প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিয়েছে।

Countdown Timer
00:01

Comments

Popular posts from this blog

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রমজানের ছুটি নিয়ে সুখবর

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রমজানের ছুটি নিয়ে সুখবর

ফলাফল প্রকাশ দেখবেন যেভাবে!